‘সব কটা জানালা’র সুর শুনে কেঁদে ফেলেছিলাম

০৭:৩৬, ২৩ জানুয়ারি ২০১৯

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বয়সে আমার ছোট। সে সব সময় আমাকে ‘সাবিনা আপা’ বলে ডাকত। আমি বুলবুলকে নাম ধরে ডাকতাম। পরিচয়ের শুরুর দিকে বুলবুল আমাকে প্রায়ই গান শোনাতে আসত। বাচ্চা ছেলে কেমন গান করবে—এমন একটা ধারণা ছিল আমার মধ্যে। কিন্তু একদিন বুলবুলের গান শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। এর পর থেকে কত গান করেছি হিসাব নেই। বুলবুলের লেখা ও সুর করা দেশের গানই গেয়েছি ২৫টির বেশি। সর্বশেষ বছরখানেক আগে একটি সিনেমার জন্য ওর গান করেছি।

বুলবুলের কালজয়ী গান ‘সব কটা জানালা’ আমি করেছি। আরো অসংখ্য কালজয়ী গান রয়েছে ওর। বুলবুলের কোন গানটা আমি প্রথম করেছিলাম তা আর মনে নেই। তবে ওর সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় ১৯৭৭ কিংবা ১৯৭৮ সালে। ১৯৭৯ সালে প্রথম ওর গান করি। বিটিভিতে পাঁচ-ছয়টা গান করি একসঙ্গে। ‘ও মাঝি নাও ছাড়িয়া দে’, ‘একদিন ঘুম ভেঙে দেখি নাই’ এবং ‘এই দেশ আমার সুন্দরী রাজকন্যা’—এই তিনটা গানের কথা মনে আছে আমার। আর ‘সব কটা জানালা’ গেয়েছি ১৯৮০ সালে। আরেকটা গান আমার খুব মনে পড়ে ‘মনটা যদি খোলা যেত সিন্দুকেরই মতো’।

‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ গানটি লেখার ধারণা নজরুল ইসলাম বাবুকে দিয়েছিল বুলবুলই। বাবুও কিছু ধারণা যোগ করে নিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে গানটি লেখা হয়েছিল। সুরটা শুনে অবাক হয়ে গেছি। এও কি সম্ভব! বুলবুলকে বললাম, সুরটা তুমি এ রকমভাবে কী করে এত সুন্দরভাবে বসালে? আমি প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলাম। তারপর বাকিটা তো ইতিহাস। বুলবুল মুক্তিযোদ্ধা; সে কারণে তার গানগুলোও বৈচিত্র্যময়। ওর দেশের গানগুলো আর আট-দশটা দেশের গানের মতো নয়। প্রতিটি গানের মধ্যে ছবি আছে; গানটা যখন শুনছি, তখন দেখতেও পাচ্ছি।

বুলবুলের গান ও সুর এত অল্প সময়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। তাই ওর গান ও সুর নিয়ে কিছু বলতে চাই না। এ ছাড়া ওর বেশির ভাগ গান এখনো মানুষের মুখে মুখে, সবাই জানে ওর সম্পর্কে। বুলবুলের প্রতিটি গানে আমি একটি ছবি দেখতে পেতাম। আমরা আগে সচরাচর যেসব গান করতাম, সেসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ওর গান। ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানির মাসি হতে দেব না’—এই গান যে গাইবে বা শুনবে, তার মধ্যেই একটা ছবি ভেসে উঠবে। 

ওকে আমরা মূল্যায়ন করতে পারিনি। বুলবুলের মতো এমন প্রতিভা আসবে বলে মনে হয় না। সে রকম জিনিয়াসের আসলে কোনো দাম দিতে পারিনি। বুলবুল শুধু একজন সংগীত পরিচালক বা সুরকার নয়, এ দেশের একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধাও। দেশ স্বাধীন করতে মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল সে। আমি জানি না এমন সাহসী যোদ্ধা লাখে বা কোটিতেও একজন হয় কি না। এখন আমরা অনেক কথা বলছি, বলব। কিন্তু বেঁচে থাকা অবস্থায় আসলেই কোনো মূল্য দিতে পারিনি।

অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর বুলবুলের সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে ফোনে প্রায়ই কথা হতো। সুস্থ হয়ে উঠলে পুরনো গানগুলো নতুনভাবে করার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। কারণ বাংলাদেশ টেলিভিশনের পুরনো গানগুলো এখন হারাতে বসেছে। তাই এগুলো সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা ছিল। এখন আমি নিজেই আবার গাইব পুরনো গানগুলো।

বুলবুলের এই প্রস্থান অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল সংগীতাঙ্গনে। এই অভাব কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়।

সাবিনা ইয়াসমিন : সংগীতশিল্পী

অনুলিখন—রবিউল ইসলাম জীবন ও শাখাওয়াত হোসাইন

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ