অন্য কোনোখানে

জাহাজমারা ও তুফানিয়ায় একদিন

এম সোহেল ০৪:২৮, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

দীর্ঘদিন ধরেই জম্পেশ একটি আড্ডা ও একসঙ্গে ঘোরাঘুরির ইচ্ছা ছিল। হাতের কাছে সমুদ্র সৈকত—জাহাজমারা। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা আসে। বালুচরে লাল কাঁকড়া। ঢেউয়ের গর্জন। বাতাসের তালে ঝাউপাতার শো শো শব্দ। সমুদ্রতটে চিকচিকে বালু। আর সমুদ্রের জলরাশির ঢেউ খেলা। সঙ্গে আছে ভোরের পূবাকাশে সমুদ্রের বুক চিরে জেগে ওঠা লাল সূর্য, বেলা শেষে পশ্চিমাকাশে হেলে পরার দৃশ্য। নাম প্রস্তাব করতেই একবাক্যে রাজি হয়ে যান সবাই। সঙ্গে যোগ হয় আরো একটি নান্দনিক স্পট—তুফানিয়া।

নির্ধারিত দিনে কাকডাকা ভোরে ক্লাবের সদস্যরা একত্র হলাম। এরপর যাঁর যাঁর মোটরসাইকেলে একেক করে উঠে পড়লাম। গন্তব্য উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে খালগোড়া খেয়াঘাট। ফাঁকা রাস্তা বলে খেয়াঘাটে পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগেনি। দারছিঁড়া নদী পার হলাম আমরা। এরপর উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের চরগঙ্গা এলাকা। ফের পৌনে এক ঘণ্টার বিরামহীন যাত্রা। সামনেই আমাদের মূল গন্তব্য জাহাজমারা সৈকত। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি সবুজ বন। গাঁয়ের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে শোভাযাত্রার মতো মনে হচ্ছিল আমাদের মোটরসাইকেলের মিছিল! আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন ওখানকার স্থানীয় কয়েকজন সহকর্মী। জাহাজমারা সৈকতের অদূরেই তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটায় তখন সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিট।

সবাই একত্রে প্রথমে জাহাজমারা সৈকতের উদ্দেশ্যে রওনা হই। পথে সারি সারি ঝাউবন আর পাখ-পাখালির কলরবে মুখরিত পরিবেশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাই সৈকতে। চিকচিকে বালুতে পা ফেলে হাঁটতে থাকি। যেদিকে তাকাই দেখি লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি আর সাদা ঝিনুকের সমারোহ। কানে বাজছে ঝাউবনের শো শো শব্দ। সঙ্গে দূর দেশ থেকে উড়ে আসা অতিথি পাখির কিচিরমিচির। হালকা বাতাসে চোখ বুজলে মনে হয় কোনো এক স্বপ্নরাজ্যের অতিথি আমরা।

প্রকৃতির সঙ্গে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে এবার ছুট তুফানিয়ার চরে। জাহাজমারা স্লুইস গেট বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সওদাপাতি কিনে নিলাম। এখন আর মোটরসাইকেলে যাওয়ার সুযোগ নেই। মোটরসাইকেল রেখে নৌযানে চেপে বসি সবাই। ছোটখালের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে ট্রলার। দুই পাশে সবুজ বন। সহকর্মীদের কেউ মোবাইলে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। যাঁরা একধাপ এগিয়ে তাঁরা ফেসবুক লাইভে সবাইকে দেখাচ্ছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কেউ মগ্ন ফটোগ্রাফিতে। মাঝেমধ্যে বন্যপ্রাণীদের হঠাত্ দেখা পেয়ে সবাই হৈ-হুল্লোড় আর চেঁচামেচিতে মেতে উঠছেন। যেতে যেতেই খালের মধ্যে দেখা মিলল পাতি তিসাবাজ, সাদা কলার্ড মাছরাঙা, পানকৌড়ি, সাদা বক, খেকশিয়ালসহ নানা ধরনের পাখ-পাখালি আর বন্যপ্রাণী। ছোট খাল পেরিয়ে এবার বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পড়ল ট্রলার। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আবার সহকর্মীদের চিত্কার-চেঁচামেচি। আবার কী? তাকিয়ে দেখি ডলফিনের জাম্পিং। যদিও সচরাচর দেখা মেলে না। ডলফিনের জাম্পিং দেখে আমাদের ভ্রমণ তৃপ্তি কয়েক গুণ বেড়ে  গেল। এরপর সাগরে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করতে করতে কিছুক্ষণ পর পৌঁছে গেলাম তুফানিয়ার চরে। কূলে ট্রলার ভিড়তে না ভিড়তেই একেক করে নামতে শুরু করল সবাই। যেন এক প্রতিযোগিতা কে নামে কার আগে!

চারদিকে নদী আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ বনাঞ্চলে সৃষ্ট এই দ্বীপ। প্রায় চার কিলোমিটার সমুদ্রতট ঘিরে রয়েছে বিশাল ঝাউবাগান। হাঁটতে হাঁটতে কেউ কেউ ঢুকে পড়ল ঝাউবাগানে। একটু পরই দেখা মিলল জেলে নৌকার  কাছে অসংখ্য অতিথি পাখি। উড়ন্ত পাখিদের মনোরম দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার আনন্দে মেতে উঠল সবাই। বনের মধ্যে দলবেঁধে ঘোরাঘুরি শেষে আবার ট্রলারে উঠে পড়ি সবাই। সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমের আকাশে হেলে পড়েছে। এবার খাবারের আয়োজন। তুফানিয়ার অদূরে নদীর মাঝেই ট্রলার নোঙর করল মাঝি। সেখানেই ট্রলারে বসে খাবার খেলাম আমরা। এবার ঘরে ফেরার পালা।

 

কিভাবে যাবেন

সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকার সদরঘাট থেকে একটি লঞ্চ রাঙাবালীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। ঢাকা থেকে সন্ধ্যা ৬টায় যাত্রা করে পরদিন সকাল ১১টায় কোড়ালিয়া লঞ্চঘাট পৌঁছে। এরপর মোটরসাইকেলে ২০ মিনিটের মধ্যে রাঙাবালী খালগোড়া বাজার খেয়াঘাট।

 

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ