সময়ের প্রতিধ্বনি

সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক এবং নেপথ্যের কাহিনি

মোস্তফা কামাল ০৪:১২, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

একজন লেখক বড় হন তাঁর লেখার গুণে, পুরস্কারের গুণে নয়। তবে পুরস্কার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। টাকা-পয়সা খরচ করে, ক্লাবে পার্টি দিয়ে যাঁরা পুরস্কার নেন, তাঁরা কি সত্যিই অনুপ্রেরণা অনুভব করেন? আর পার্টিতে অংশ নিয়ে কিংবা খাম পেয়ে যাঁরা পুরস্কার দেন, তাঁরা কি কোনো অনুশোচনায় ভোগেন না?

এ ধরনের প্রশ্ন ইদানীং ব্যাপকভাবে সামনে উঠে আসছে। যদিও এসব কথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কানে তুলছেন না। কানে তুলা দেওয়ার মতোই অবস্থা। শুনেও না শোনার ভান করা আর কি! আমার জানা মতে, অনেক বড় মাপের লেখকরাও জীবদ্দশায় কোনো পুরস্কার পাননি। কাউকে কাউকে দেওয়া হয় মরণোত্তর পুরস্কার; যার কোনো মানে নেই। জাত লেখকরা নিজের তাগিদেই লেখেন। তাঁরা আসলে জন্মগতভাবেই লেখক। পুরস্কারের আশায় তাঁরা লেখেন না। আর ঘষেমেজে কি লেখক হওয়া যায়? আমার তা মনে হয় না।

আমরা মূল্যায়ন করি বা না করি, মানি বা না মানি, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন পাওয়া তো দূরের কথা; বরং অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন তিনি। আসলেই আমরা মানি লোককে মান দিতে জানি না।

বঙ্গবন্ধু বলেছেন, পরশ্রীকাতর বাঙালি। অন্যের ভালো দেখলে সে কাতর হয়। প্রতি পদে তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি। আমরা ভালো কাজের স্বীকৃতি দিই না; বরং ঈর্ষা করি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখে আসছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যাঁরা বিশ্বাসই করেন না, তাঁদের কেউ কেউ একুশে ও স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। কারণ মন্ত্রিসভায় তাঁদের সুহৃদরা ছিলেন। এ নিয়ে সুহৃদ মন্ত্রীরা এমন মন্তব্যও করেছেন যে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আবার চেতনা কী? বন্ধুত্বের চেয়ে কি চেতনা বড়?

পুরস্কার নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। নোবেল পুরস্কার নিয়েও অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ আছে। তার পরও ন্যূনতম মান বজায় রাখতে পুরস্কারদাতা প্রতিষ্ঠানকে সজাগ থাকতে হয়।

আমাদের দেশে স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদক দেয় সরকার। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমিও লেখকদের পুরস্কার দিয়ে থাকে। কিছু পত্রিকা ও সাময়িকীও পুরস্কার দিচ্ছে।

সরকারি-বেসরকারি সব পুরস্কার নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন ওঠার সংগত কারণও আছে। কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ঘোষণার আগে আমরা দেখেছি, বিশিষ্ট কিছু লেখক-বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে ঢাকা ক্লাবে জম্পেশ পার্টির আয়োজন করেন ‘বিত্তশালী লেখক’দের কেউ কেউ। টানা কয়েক দিন সেই পার্টি চলে। বিপুল অর্থ খরচ করে যিনি পার্টির আয়োজন করেন, তাঁর নামই উঠে আসে পুরস্কারের তালিকায়। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি, নাকি পার্টি আয়োজনের স্বীকৃতি?

পুরস্কার ঘোষণার পর সবাই বাহবা দেয়। না জানি কী লিখেছেন! খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সেই লেখার কোনো সাহিত্য-মানই নেই। মনের আনন্দে অনেকেই অনেক কিছু লিখতে পারেন। টিকে থাকার মতো কিছু লেখা তো থাকতে হবে! তা না হলে পুরস্কার প্রশ্নবিদ্ধ হবে—এটাই স্বাভাবিক।

একবার বাংলা একাডেমির পুরস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন সদস্যকে প্রশ্ন করা হলো, ওমুককে তো আপনারা পুরস্কার দিয়েছেন! ওনার কোনো লেখা আপনি পড়েছেন?

আমতা আমতা করে ওই সদস্য বললেন, না মানে ওভাবে পড়া হয়নি!

তাহলে পুরস্কার দেওয়ার জন্য মনোনয়ন দিলেন কিভাবে?

মহাপরিচালক বললেন তিনি দিতে চান, আমরা আর না করিনি।

আরেকজন বললেন, বয়স হয়েছে তো! তাই দেওয়া হলো।

এসব কথা মুখ ফুটে কেউ বলেন না। বলার সাহস করেন না। যদি একজন হুমায়ুন আজাদ থাকতেন কিংবা আহমদ ছফা থাকতেন, তাহলে হয়তো মুখের ওপর বলে দিতেন, এসব কী হচ্ছে? কোথায় পাব প্রিয় লেখক হুমায়ুন আজাদ কিংবা আহমদ ছফাকে? সত্যিই, জাতি আজ এক ক্রান্তিকালে এসে দাঁড়িয়েছে। সর্বত্র তোষামোদি আর পদলেহনকারীদের বাড়বাড়ন্ত। জি-হুজুর মার্কা তেলবাজদের কনুইয়ের ধাক্কায় ভালো লোকরা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। প্রতিবন্ধী সাজা ছাড়া তাঁদের আর উপায় কী!

শিশু একাডেমিও সরকারি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর শিশুসাহিত্যিকদের পুরস্কার দিয়ে থাকে। প্রতিবারই স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে ওই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। প্রতিবছর কিছু চেনা মুখই ওই পুরস্কার লাভ করেন। শিশু একাডেমির লোকরা কি জানেন না, শিশু-কিশোর নিয়ে কারা লেখালেখি করেন? পুরস্কার পাওয়ার জন্য লেখকরা কেন বই জমা দেবেন? কেন তাঁরা নিজেরা সংগ্রহ করে ভালো বইয়ের লেখককে পুরস্কার দেন না?

এবার একটি পত্রিকার পুরস্কারের প্রসঙ্গে কিছু বলি। ওই পত্রিকাটি প্রতিবছর লেখকদের পুরস্কার দিয়ে থাকে। তাদের একটি জুরি বোর্ড আছে। ওই বোর্ডে পাঁচজন লেখক-কথাসাহিত্যিককে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কোনো স্বাধীনতা নেই। হাত-পা বাঁধা। তাঁদের বই বাছাই করে দেওয়া হয়। ওই বইয়ের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

একবার ওই জুরি বোর্ডের এক সদস্য বৈঠকের শুরুতেই পত্রিকার সম্পাদককে উদ্দেশ করে বললেন, ওমুক বইটি কেন নেই?

হয়তো জমা হয়নি।—সম্পাদকের জবাব।

জুরি বোর্ডের সদস্য বললেন, না না! আমি জানি জমা হয়েছে। আপনি আপনার লোকদের বলুন বইটা টেবিলে দিতে।

পরে ঠিকই বইটা টেবিলে দেওয়া হলো। কিন্তু কেউ আর ওই বই হাতে তুললেন না। সম্পাদক চান না। জুরি বোর্ডের সদস্যরা কোন সাহসে ওই বই নিয়ে আলোচনা করবেন!

পুরস্কার দেওয়া নিয়ে এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। গা শিউরে ওঠা অনেক কাহিনিই চাপা দেওয়া হয় ‘বিশিষ্ট’দের মান যাবে বলে। কিন্তু ‘বিশিষ্ট’রা কি একবারও ভাবেন, তাঁরা যা করছেন তা অনৈতিক ও অন্যায়! কেন একটি খামের বিনিময়ে কিংবা অন্য সুবিধা নিয়ে নিজেদের মাথা বিকিয়ে দেবেন! তাঁরা কি এতই সস্তা হয়ে গেছেন!

বেশি দিন আগের কথা নয়; একটা সময় তো প্রকৃত লেখকরাই মূল্যায়িত হতেন। অতীতে স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ খুব একটা ছিল না। দু-একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকৃত কবি-সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন করা হতো। সেই অবস্থানটা ধরে রাখতে কেন ব্যর্থ হলো মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি? কেন বিতর্কিত করা হলো সাহিত্য পুরস্কার? এই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হলো কার স্বার্থে! কেন এখন লেখকরা ভাবতে পারেন না, বাংলা একাডেমির পুরস্কার তাঁদের জন্য অনেক বড় সম্মানের?

সবাই নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, কিছু পত্রিকাও নিজেদের ঘরানার লেখক বলে একটি গোষ্ঠী তৈরি করে। তাঁদের দিয়ে নিজেদের মতো করে লেখায়। তাঁদের জন্য পুরস্কারের আয়োজন করে। ওই গোষ্ঠীর বাইরে আর কেউ যেন লেখক নন! লেখকদের কি কোনো নির্দিষ্ট সীমানা থাকা উচিত? তাঁরা কি ঘরানা মেনে চলবেন? যারা ঘরানা সৃষ্টি করে তাদের আসলে উদ্দেশ্য কী?

নিশ্চয়ই কোনো মহৎ উদ্দেশে এসব করা হয় না! সাহিত্যে নিজস্ব বলয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এসব করা হয়। নিজস্ব বলয়ের লেখকদের পুরস্কার দিয়ে আলোচনায় আনা হয়। তারপর ওই লেখকদের জন্য পুরস্কার বাগিয়ে আনার নানা অপচেষ্টাও চলতে দেখা যায়। আর তাতেই সাহিত্যাঙ্গন কলুষিত হয়েছে। এই সুযোগে ‘বিত্তশালী লেখক’রা ফায়দা হাসিল করছেন।

একটা সময় খুব বলা হতো, ওমুক ‘জনপ্রিয়’ ধারার লেখক। ওমুক ‘সিরিয়াস’ ধারার লেখক। আসলেই কি সাহিত্য এ রকম কোনো ধারা মেনে চলে? তাহলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কোন ধারায় ফেলা হবে? তাঁরা উভয়েই তো তাঁদের সময়েই জনপ্রিয় ছিলেন। এখনো তাঁরা তুমুল জনপ্রিয়। তাঁদের পাঠক সবচেয়ে বেশি। অবশ্য তাঁদের সময়কালে তাঁরা সমালোচিত ছিলেন। কিন্তু মহাকালের বিচারে তাঁরাই টিকে আছেন। কালের বিবর্তনে ভালো লেখাই টিকে থাকবে। অন্য সব হারিয়ে যাবে।

আসলে পুরো দেশটাই এক জিম্মিদশায় পড়েছে। সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রেই এক অশুভ কালো ছায়া। আমরা আশা করি এ অবস্থার অবসান হবে। সুসময় নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। শুভবুদ্ধির উদয় হবে শাসকদের, নীতিনির্ধারকদের। নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয়ই এসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ