জলের বাড়ি

তুফানিয়ায় নোঙর

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৭:২৪, ৭ মার্চ ২০১৯

এক যাত্রায় কম করেও সাত দিন বাড়ির বাইরে থাকা লাগে জেলেদের। সারা দিন সাগরে মাছ ধরে সাগরদ্বীপ তুফানিয়ায় এসে রাত কাটান তাঁরা। সে জীবনের খোঁজ নিতে তুফানিয়ায় গিয়েছিলেন এম সোহেল

চর তুফানিয়া
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগরের চর তুফানিয়া। কোনো স্থায়ী বসতি নেই। লাল কাঁকড়ার নিরাপদ আবাসভূমি। ষাটের দশকে দ্বীপটি জেগে ওঠে। তুফানের সময় যেমন হয়, তেমনি বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ত বলে জেলেরাই নাম দিয়েছেন তুফানিয়া। বন বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় দেড় হাজার একর আয়তন এই চরের, তার মধ্যে ৫০০ একর বনাঞ্চল। কেওড়া, ছইলা, গেওয়া, বাবলা ইত্যাদি এখানকার উল্লেখযোগ্য গাছ।

বসির মিয়া বাড়ি ছেড়েছেন দুদিন আগে। বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বড়মাছুয়া গ্রামে। ট্রলারটির মালিক তিনি নিজেই। দুই মেয়ে তাঁর। বড়টি লামিয়া আক্তার পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। আর ছোট তানজিলা স্কুলে যাবে যাবে করছে। সাত দিনের চাল, ডাল, আলু, পটোল, জ্বালানি, মসলাপাতি, বরফ, তেল ইত্যাদি নিয়ে সাত দিনের জন্য সাগরে এসেছেন। এক যাত্রায় খরচ হয় ২০ হাজার টাকা। সারা দিন জাল ফেলে ছোট-বড় প্রায় ১০ কেজি মাছ তুলতে পেরেছেন। তারপর সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার কিছু সময় বাদে এসে পৌঁছেছেন তুফানিয়ায়। তীরে নোঙর ফেলে মাছ বাছতে বসেছেন। ফাঁকে রান্নাবান্নাও চলছে। মাঝেমধ্যে গান গেয়ে ক্লান্তি তাড়াচ্ছেন। তারপর সূর্য ডুবে গেলে তুফানিয়ায় কুপি বাতি জ্বলে ওঠে। ম্লান আলোয় ভাজা মাছ আর মরিচ পোড়া দিয়ে খাওয়া সারেন বসির মিয়ারা। রাতেও মাছ ধরতে যান কোনো কোনো দিন। গত রাতেই যেমন বেশ মাছ পেয়েছেন বসির মিয়া।

মাছ ধরতে যাই

তুফানিয়া থেকে ২-৩ ঘণ্টা সাগরের দিকে গেলে গভীর সাগর। গভীর সমুদ্রে থাকা যায়, তবে ডাকাতের ভয় আছে। বরং কূলে ফিরে বরফের মধ্যে মাছগুলো রেখে দেওয়া নিরাপদ। এখন সাধারণত পোয়া, ফাওয়া, রামছোস, তুলারঢাডিসহ ছোট ছোট মাছ বেশি পান। পৌষের শেষ থেকে ফাগুনের শেষ পর্যন্ত জেলেরা বেশি ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে মাছ ধরেন। এ সময়ে তাঁরা তুফানিয়ার তীরে নোঙর করে থাকেন। এক সপ্তাহ পর পর পাথরঘাটার চরদোয়ানি গিয়ে মাছ বিক্রি করেন। তবে জ্যৈষ্ঠ মাসের পর থেকে আর এ জাল দিয়ে মাছ ধরেন না। তখন আবার বড় ফাঁসের জাল দিয়ে ইলিশ ধরেন। সে সময় সুন্দরবনের কাছাকাছি দুবলার চর এলাকায় থাকেন বেশি। বসির মিয়ার পাশের ট্রলারের মাঝি আক্কাস মিয়া। আলাপ জুড়ে দিয়ে বললেন, ‘ঝড়ের সময় গাঙে অত্যধিক ঢ্যাপা (ঢেউ) থাকে।’ তাঁর বাড়ি লালমোহন উপজেলার মহেষখালী গ্রামে। বয়স্ক মানুষ। জলেই গেছে জীবনের বেশির ভাগ সময়। এখন তিনি কিছুটা ক্লান্ত।

 

কামাল মাঝির কথা

তখন অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। বসির মিয়ার ট্রলারের কাছেই নোঙর করল এসে কামাল মাঝির নাও। রাঙ্গাবালী উপজেলার কাউখালী গ্রামের স্লুইস এলাকার বাসিন্দা তিনি। কামাল মাঝিকে পেয়ে মাঝি-মাল্লাদের ক্লান্তি যেন উবে গেল। দারুণ বাঁশি বাজান মানুষটি। সদা হাস্যোজ্জ্বল। বয়স তাঁর চল্লিশের বেশি। তিন বছর হলো মাঝির দায়িত্ব পেয়েছেন। আগে মাল্লা ছিলেন। বললেন, ‘গভীর সাগরে থাহি। এখানে যারা আছি কারো সঙ্গে কারো রক্তের সম্পর্ক নাই। কিন্তু যারা আছি সবাই সবারে আপন মনে করি। একজনের বিপদে আরেকজন পাশে থাহার চেষ্টা করি। সারা দিন যার যার কাজে ব্যস্ত থাহি। অবসরে একসঙ্গে হই। তহন বাঁশি বাজালে নিজেরও  ভালো লাগে। আমার বাঁশির জন্য সবাই অপেক্ষা করে থাকে। সবার অপেক্ষা কামাল মাঝি কহন ঘাটে আইব।’

 

যে কারণে তুফানিয়ায়

বসির মাঝির ট্রলারের সুমন মিয়া বলেন, ‘তুফানিয়া নিরাপদ এলাকা। এখানে থাকলে জলদস্যু বা  ডাকাতের তেমন কোনো ভয় থাকে না। এখানের বনে কোনো ধরনের হিংস্র জন্তুও নেই। জাহাজমারা স্লুুইস বাজারও কাছে। বাজার-সদাই করা যায়। খাবার পানি ফুরিয়ে গেলে ওখানকার টিউবওয়েল থেকে নিয়ে আসি। তবে তুফানিয়ার চরে যদি একটা টিউবওয়েল থাকত তাইলে আরো ভালো হতো।  

 

আব্দুল বারেকের মনে ঝড়

জেলেদের সঙ্গে জলের গভীর মিতালি। তবু মাঝেমধ্যে সেই সম্পর্ক ওলটপালট হয়ে যায়। আব্দুল বারেক শরীফ নামের এক সিনিয়র মাঝি ইলিশ মৌসুমের এক ঝড়ের রাতের কথা বললেন—‘রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টা বাজে। গভীর সাগরে জাল ফেলা শেষে নোঙর করে বসে আছি সবাই। চান্নি (জোছনা) পশার (আলো) রাত। হঠাৎ করে অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। এরপর হালকা বাতাসে ট্রলারখানা ঢুলতে (দুলতে) রইল। আস্তে আস্তে বাতাস বাইরা যায়। ঢ্যাপাও (ঢেউ) বাড়তে রইলে ছইর (ছাউনি) মধ্যে থেকে সবাই গোলইতে বাইরাই আইছে। এরপর মুষলধারে বৃষ্টি। প্রায় আধা ঘণ্টা ধইরা যেমনি বাতাস, তেমনি বৃষ্টি; ঢেউর কথা তো আর কইয়া লাভ নাই। এক পাশ দিয়া পানি ওডে আর অন্য পাশ দিয়া গড়াই পড়ে। সবাই দোয়া-দরুদ পড়তে রইল। সান্ত্বনা দিতে রইলাম। কিন্তু আমি নিজেই তহন ভয় পাইছি। ভাবছি এখনই বুঝি নদীর গভীরে চইলা যামু। এই বুঝি মায়ের কোল খালি করে আল্লাহ নিয়ে যাবে। আর কোনো দিন ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীর মুখ দেখা হবে না। সেদিনের সেই রাতের কথা এখনো মনে পড়ে। আল্লাহর অসীম রহমত ছিল, তাই আজও বেঁচে আছি।’

 

বড় কষ্টের জীবন

‘এ জীবন বড় কষ্টের ভাইজান! জীবন-মরণ বাজি রাইখা মাছ ধরতে হয়। তবু পোলাপাইন (ছেলে-মেয়ে) নিয়া দুইডা ডাল-ভাত খাইয়া বাঁইচা থাকার জন্য সাগরে যাই। অন্য কাজ জানিও না। ঝড়-বন্যার মধ্যেও গহিন সাগরে পড়ে থাকতে হয়। কত ঈদে তো বাড়ি যাওয়ারও সুযোগ হয় না।’ বলছিলেন ওই কামাল মাঝি।

ছবি : লেখক

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ