দেড় শ’ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

রাঙ্গাবালীতে অকাল বৃষ্টিপাতে দিশেহারা তরমুজ চাষিরা

রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি ১০:০৪, ৮ মার্চ ২০১৯

তরমুজ ক্ষেতে পানি জমে আছে। চাষীরা দিশেহারা হয়ে পানি সেচে ব্যস্ত হয়ে পরেছেন। তাদের সহোযোগিতা এগিয়ে আসছে পরিবারের সকল সদস্য এমনকি বাদ পড়েনি নারীসহ শিশুরাও। এমনিভাবে পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে তারা। চারিদিকে তাকানোর কোন সুযোগ নেই। বালতি, খোন্তা আর কোদাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন চলছে। অপরদিকে ক্ষেতে পাওয়ার পাম্প লাগিয়ে পানি নিষ্কাশন করছে একদল চাষী। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নরে সাজির হাওলা গ্রামে তরমুজ ক্ষেতের এমনই চিত্র দেখা যায়। গত ২দিনের টানা বৃষ্টিতে ওই গ্রামের তরমুজ ক্ষেতে পানি জমে এ অবস্থায় পরিণত হয়েছে।

পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যস্ত চাষি জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের সব শ্যাষ ওইয়া গ্যাছে। ধারদেনা কইরা দেড় কানি জমিতে তরমুজ লাগাইছি। হেই ক্ষ্যাত (ক্ষেত) বৃষ্টিতে তলাইয়া গ্যাছে। এহন পানি সরাইন্যা চিষ্টা (চেষ্টা) করতাছি। পানি সরাইতে না পারলেতো সব শ্যাষ ওইয়া যাইবে।’ পাশের ক্ষেতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে পানি সরানোর কাজে ব্যস্ত চাষী জিলাম মুন্সি বলেন, ‘এই বৃষ্টির পর যদি রউদ (রোদ) উডে তইলে সব চারা মইরা যাইবে। সুদের উপার টাহা (টাকা) আইন্যা তরমুজ ক্ষ্যাত করছি, এহন কি দিয়া এই টাহা পরিশোধ করমু। পাওয়ার পাম্প ও বালতি দিয়ে পানি সেচ করতে করতে চাষিরা হতাশ হয়ে পরেছেন।

এ দিকে উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কাউখালী গ্রামের তরমুজ চাষি মোস্তফা দফাদার বলেন, ‘আমি ২ কানি জমিতে তরমুজ দিছি। আমার ১লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ হইছে। এ টাকা মাস সুদে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে আনছি। কিভাবে টাকা পরিশোধ করমু সেই চিন্তা করছি।’ বলেন, ‘দাদনের টাকা দিয়া তরমুজ দিছি। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে তরমুজ চারার অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখনও ক্ষেতে পানি জমে আছে। বিভিন্নভাবে পানি সরানোর চেষ্টা করছি। পানি সরাতে না পারলে বড় ধরণের ক্ষতি হবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি তরমুজ মৌসুমে এ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ করা হয়েছে। এবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫০০ হেক্টর। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে তরমুজ আবাদ হলেও অকাল বৃষ্টিপাতে ক্ষেতে পানি জমে মঙ্গলবার পর্যন্ত শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ অর্থাৎ মোট উৎপাদনের ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির তরমুজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সাধারণত ১ হেক্টর জমিতে ৩০ টন (৩০০০০ কেজি) তরমুজ উৎপাদন হয়ে থাকে। ১ কেজি তরমুজের মূল্য ৮ টাকা দরে ৩০ টন তরমুজের মূল্য ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। এতে ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ১৫১ কোটি ২০ লাখ টাকার মত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে ক্ষেত থেকে পানি সরে গেলে সঠিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় সম্ভব হবে। শুধু তরমুজই নয় মুগডালসহ বিভিন্ন রবি শস্যেরও শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ কৃষকরা আরো জানান, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত কয়েক দফার বৃষ্টিপাত ও ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার তরমুজ ক্ষেতে পানি জমে রয়েছে। তাই বেশিরভাগ তরমুজ চারা এবং ফলন পচে নষ্ট হয়ে যাবে। আবার পানি নিষ্কাশনের পর রোদ উঠলেও তরমুজের ক্ষতি হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সর্বশেষ মঙ্গলবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার তরমুজ ক্ষেতে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থায় তরমুজ চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কেউ মাটি কেটে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। কেউ আবার পাওয়ার পাম্প বসিয়ে ক্ষেতের পানি সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

উপজেলার গঙ্গিপাড়া গ্রামের তরমুজ চাষি সুমন প্যাদা বলেন, ‘কয়েকদিনের বৃষ্টিতে তরমুজ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। মহাজোনের দাদন ও ঋণের টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে সবাই সেই চিন্তাই করছে।’ রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাঙ্গাবালীর প্রধান অর্থকরী ফলন তরমুজ। কিন্তুবৃষ্টিতে তরমুজ চাষিরা অনেকে সর্বশান্ত হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে চাষিদের সরকারি সহায়তার প্রয়োজন।’

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) আব্দুল মান্নান জনান, ‘বৃষ্টিপাতে ৬০ ভাগ তরমুজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছি। এতে কৃষকের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পানি নেমে গেলে সঠিকভাবে বলা যাবে। আমরা এখনও কর্তৃপক্ষকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারবো না। দুই চারদিন পরে আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারবো। তখন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিবে যে, ক্ষতিগ্রস্তদের কোন ধরণের সহায়তা করা হবে কিনা।’

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ