ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: নিখোঁজ জাকিরকে নেওয়া হয় তুরস্কের কথা বলে

অনলাইন ডেস্ক ১০:০০, ১৫ মে ২০১৯

নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন জাকির। বাড়ির সামনে নিজ জায়গায়ই ছিল মুদি দোকান। বড় ভাই স্পেন প্রবাসী। গ্রামে জমিজমাও রয়েছে। ৪ বছর আগে বিয়ে করার পর ঘরজুড়ে আসে ফুটফুটে ২ মেয়ে সন্তান সামিয়া (৩) ও তাসফিয়া (১)। বৃদ্ধ মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ছিল সুখের সন্তান। তুরস্ক যাওয়ার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের তবে সাগরপথে ভীত থাকায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল সরাসরি বিমানে।

সে মতে বেয়াই নূর নবী খলিফার সাথে সাড়ে ৬ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। কিন্তু জাকিরকে সুদান দিয়ে লিবিয়া নেওয়া হয় নূর নবীর ভাই দালাল নুরুল ইসলাম খলিফার কাছে। এরপরই জাকিরের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। পরিবারটির কাছ থেকে কয়েক দফায় আদায় করা হয় প্রায় ৯ লাখ টাকা। এরপর গত বৃহস্পতিবার সাগর পথে লিবিয়া থেকে ইতালি যাত্রাপথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হয় জাকির হোসেন (২৮)। খবরটি তার বাড়ি শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের ৮নং চর বাচামারা গ্রামে পৌঁছালে পরিবারটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে দালাল নুরুল ইসলাম বর্তমানে নিজ গ্রামের বাড়ি একই উপজেলার শিরুয়াইল ইউনিয়নে অবস্থান করছেন।

সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের সেকান্দার হাওলাদারের ২ ছেলে, ৩ মেয়ের ৪র্থ সন্তান জাকির হাওলাদার। বড় ভাই বেলায়েত হাওলাদার স্পেন প্রবাসী। জাকির বাড়ির সামনেই মুদি দোকান করতেন। ৪ বছর আগে শান্তা আক্তারকে বিয়ের পর ঘরজুড়ে আসে ২টি মেয়ে সন্তান। সুখেই কাটছিল জাকিরের সংসার। সুখের হরিণের আশায় তারও তুরস্ক গমনের ইচ্ছা ছিল। তবে সাগর পথে ভীতি থাকায় তিনি যাচ্ছিলেন না। এমন সময় সরাসরি বিমানে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জাকিরের কাছে আসে চাচতো বেয়াই নুর নবী। চুক্তি হয় সাড়ে ৬ লাখ টাকায়। তাও তুরস্ক পৌঁছানোর পর।

চুক্তি অনুযায়ী ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার পর গত রমজানে জাকিরকে প্রথম নেওয়া হয় সুদান। কয়েকদিন পর নেওয়া হয় লিবিয়া। লিবিয়া পৌঁছানো হয় সেদেশের দালাল নুর নবীর বড়ভাই নুরুল ইসলাম খলিফার কাছে। এরপরই শুরু হয় জাকিরসহ সেদেশে আটকা কয়েক জনের ওপর অমানবিক নির্যাতন। কখনো মাফিয়া, কখনো ডন, কখনো সেদেশের পুলিশের কথা বলে পরিবারটির কাছ থেকে আদায় করা হয় প্রায় ৯ লাখ টাকা। গত বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরে লিবিয়ার উপকুল থেকে ৭৫ জন অভিবাসী নিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ হয় জাকির হোসেন।

এ ঘটনায় মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়ার আজিজ শিকদারের ছেলে সজিবে শিকদার নিহত হয়, আরো ৪ যুবক নিখোঁজ হয়। জাকির হোসেনকে হারিয়ে এখন দিশেহারা স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের লোকজন। স্বামীকে হারিয়ে কান্না যেন থামছেই না স্ত্রী শান্তা আক্তারের। অবুঝ দুটি কন্যা সন্তানকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই পরিবারের লোকজনের। বাবা সেকান হাওলাদার মা আসিরন বেগম সজ্ঞাহীন। কোনোভাবেই মানতে পারছেন না বাবা-মামা। এদিকে দালাল নুরুল ইসলাম বর্তমানে নিজ গ্রামের বাড়ি একই উপজেলার শিরুয়াইল ইউনিয়নে অবস্থান করছে। তার ভাই নুর নবী ঢাকায় আছেন বলে জানান। জাকিরের স্ত্রীর কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই গগণবিদারী কান্নায় ফেটে পড়েন।

জাকিরের অসুস্থ বাবা সেকান হাওলাদার বলেন, নূরনবী ও নুরুল ইসলাম আমার পুলারে তুরস্ক পর্যন্ত বিমানে নেওয়ার কথা বলে সুদান দিয়ে লিবিয়া নেয়। এরপর ব্যাপক মারধর কইরা দফায় দফায় সাড়ে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা নিছে। তারপর সমুদ্রে নিয়া মাইরা ফেলাইলো। আমি ওগো বিচার চাই।

জাকিরের পার্শ্ববর্তী ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মেরাজুলের মা তার ছেলের বরাত দিয়ে বলেন, নুরুল ইসলাম ও নুর নবী খুবই ধুরন্ধর। ওরা মেরাজুল ও জাকিরসহ অনেকরে আটকাইয়া বেদম মারধর কইরা আমাগো শুনাইছে। ভয়ে আমি পুলার জন্য ৯ লাখ টাকার বেশি দিছি। বৃহস্পতিবার সমুদ্রে আমার পুলা অল্পের জন্য বাঁচছে। আর জাকির সাগরে ডুইবা গেছে। ওরা আগে এত মারধর না করলে জাকির মরতো না।

ইউপি সদস্য ইউনুছ মোল্লা বলেন, জাকির ব্যবসা-বাণিজ্য কইরা ভালোই ছিল। আমাদের গ্রামের ওসহ ২ জনকে তুরস্ক নেওয়ার কথা বলে লিবিয়া নিয়ে যায়। জাকিরসহ মাদারীপুরের কয়েকজন নিহত ও নিখোঁজ রয়েছে। দালালরা এখন দেশেই আছে। ওদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে এ চক্রটিকে ধরা দরকার।

সম্প্রতি লিবিয়া ফেরৎ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকার সোবাহান মোল্লা, নুরুল ইসলাম লিবিয়ায় কোনো কাজ করে না। ওরা এদেশ থেকে মানুষ নিয়ে মাফিয়া, ডন, পুলিশের নামে তাদের আটকাইয়া নির্যাতন করে। আমার কাছ থেকে সোবাহান এভাবে লাখ লাখ টাকা নিছে। আর নুরুল ইসলামই জাকিরকে জিম্মি কইরা রাখছিল। আমরা এক জায়গায়ই আটকা ছিলাম। পরে আমি টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়ে দেশে আসছি। 

শিরুয়াইলয়ে গিয়ে দালাল নুরুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তার কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, জাকির ও মেরাজুলকে লিবিয়ায় অন্যরা আটকিয়ে রেখেছিল। আমি ৯০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিলাম। সেটাকাই ওর বাড়ির থেকে নিয়েছি। আর কোনো টাকা নেইনি। সবই মিথ্যা। আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে সব কথাও মিথ্যা। বরং আমিই ওই দেশে গিয়ে অনেকবার মাফিয়ার কাছে ধরা খাইছি। আমি কোনো দালালি করি না। 

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ