গণবদলিতে প্রকাশ্যে এসেছে ‘অনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা’

অনলাইন ডেস্ক ০২:০০, ১৩ অক্টোবর ২০১৯

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) কর্মরত স্থানীয় ও অন্য জেলার কর্মকর্তাদের মধ্যে চলে আসা ‘অনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা’ প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। গত ১০ অক্টোবরের পৃথক দুই আদেশে চট্টগ্রাম জেলার ১২ জন পরিদর্শক-টিআইকে ভিন্ন রেঞ্জে বদলি এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মরত উপপরিদর্শক থেকে নিুপদের সদস্যদের তালিকা সংগ্রহ করার মধ্য দিয়ে ‘গণবদলি’ আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর নেপথ্যে দীর্ঘদিনের ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও অনৈতিক’ স্বার্থ জড়িত রয়েছে বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্য হয়ে গণমাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি কর্মকর্তারা। তবে তাঁরা ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন অনেকটা খোলাখুলিভাবেই। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে কেউ নিজ জেলায় পদায়ন হতে পারেন না। কিন্তু সিএমপি পৃথক ইউনিট হওয়ায় সেখানে পদায়নের সুযোগ রয়েছে। ১৯৭৮ সালে নগর পুলিশের যাত্রার পর থেকেই এমন পদায়ন চলছে। একইভাবে ঢাকা জেলার কর্মকর্তারা ডিএমপি, সিলেটের কর্মকর্তারা এসএমপি কিংবা রাজশাহী জেলার কর্মকর্তারা আরএমপিতে কর্মরত। দেশের অন্য কোনো মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটে সমস্যা না হলেও সিএমপিতে সমস্যা হয়েছে মূলত অনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কারণে। পুলিশ সদর দপ্তর নিবিড় অনুসন্ধান চালালে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। 
বদলি কার্যক্রম শুরুর নেপথ্যে পুলিশের কিছু কর্মকর্তার অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগর পুলিশের ১৬টি থানাকে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ ক্যাটাগরিভুক্ত করা আছে। এসব থানায় ওসি পদে পদায়ন হওয়ার আগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ‘নজরানা’ দিতে হয়। একই সঙ্গে সরকারদলীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কিংবা মন্ত্রী-এমপির সুপারিশ প্রয়োজন হয়। সিএমপির থানাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই ওসি পদে পদায়ন হয়ে আসছে।
চট্টগ্রামে প্রচার আছে, ‘এ’ ক্যাটাগরির একটি থানার ওসির দায়িত্ব পেতে এক থেকে দেড় কোটি টাকা গুনতে হয়। তার পরও দুই পক্ষই ‘লাভবান’ হওয়ায় অঘোষিতভাবে চলে আসা এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করেন না। কিন্তু গত ১০ অক্টোবর নগর পুলিশের উপকমিশনার (সদর) শ্যামল কুমার নাথ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি এবং ওই দিনই কয়েকজন পরিদর্শক বদলির ঘটনায় নগর পুলিশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। 
চিঠিতে নগর পুলিশের উপকমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়, পুলিশ সদর দপ্তরের মৌখিক নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ অক্টোবরের মধ্যেই নিজ নিজ বিভাগে কর্মরত এসআই থেকে তদনিু যেসব পুলিশ সদস্যের নিজ জেলা চট্টগ্রাম, সেসব কর্মকর্তার তথ্যাদি ছক মোতাবেক বিশেষ বাহকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিস চট্টগ্রামে পাঠাতে হবে। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চিঠি ইস্যুর দিনই এসম্পর্কিত তথ্য বিশেষ বাহকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিসে পৌঁছে দেন।
আবার ১০ অক্টোবরই থানার ওসি হিসেবে দায়িত্বরতসহ সাতজন পুলিশ পরিদর্শক ও ট্রাফিক বিভাগের পাঁচজন টিআইকে দেশের বিভিন্ন রেঞ্জে বদলির আদেশ জারি করা হয় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। অতিরিক্ত আইজি ড. মো. মাইনুর রহমান চৌধুরী এসব বদলি আদেশে স্বাক্ষর করেন।
একই দিনে চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা ও সিএমপিতে কর্মরত ১২ জন পরিদর্শক-টিআইকে বিভিন্ন রেঞ্জে বদলির পরই মূলত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে চলে আসে। একই সঙ্গে নগর পুলিশে পর্দার আড়ালে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্বের’ কারণে গণবদলি শুরুর বিষয়টি সমালোচনায় পরিণত হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, “ইয়াবা পাচারের করিডর চট্টগ্রাম নগরীর কোনো থানার ওসি কী পরিমাণ অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নেন সেই তথ্য চট্টগ্রামের স্থানীয় কর্মকর্তাদের অনেকেই জানতে পারেন মূলত পরিচিত গণ্ডির কারণে। এরপর কানাকানি চলে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেই। ফলে ভিন্ন জেলার কর্মকর্তারা পোস্টিংয়ের জন্য নজরানা দেওয়া অর্থ তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। এ নিয়েই শুরু হয় ‘চট্টগ্রাম ও নন-চট্টগ্রাম’ কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। চলে ঊর্ধ্বতন মহলে কান ভারি করার প্রতিযোগিতা। এরই চূড়ান্ত রূপ গণবদলি।”
কর্মকর্তারা বলছেন, নগর পুলিশে উপপরিদর্শক হিসেবে বদলি হয়ে আসার পর পদোন্নতি পেয়েও সিএমপিতে থাকার সুযোগ পাওয়া এবং ঘুরে ঘুরে থানার ওসি পদে দায়িত্ব পালন করছেন এমন কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে আছেন। আবার কনস্টেবল পদে একটি বিশেষ জেলার বাসিন্দা পরিচয়ে প্রায় এক যুগ আগে বদলি হয়ে আসা সহকারী উপপরিদর্শক এখন গোয়েন্দা পুলিশের ‘ক্যাশিয়ার’। যদিও নগর গোয়েন্দা পুলিশে ‘ক্যাশিয়ার’ পদ বলে কিছু নেই বলেই দাবি করা হয়। গুঞ্জন আছে, বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা ‘ক্যাশিয়ার’ পদের সমন্বয় করে চলেছেন। 
এতসব গুঞ্জন ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গণবদলি এবং প্রকৃতপক্ষে সিএমপিতে কোনো অনৈতিক দ্বন্দ্ব কিংবা বৈরিতা আছে কি না তা জানতে চেয়ে দুই দফা ফোন করা হলেও অন্য প্রান্ত থেকে সাড়া দেননি নগর পুলিশ কমিশনার মাহাবুবর রহমান। ফলে গণবদলি নিয়ে আতঙ্ক ও দ্বন্দ্ব নিয়ে নগর পুলিশের বক্তব্য জানা যায়নি।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ